আতাউর রহমান: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সরকারে শিক্ষক থেকে সরকার প্রধান হয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সঙ্গে রয়েছেন আরও ১৬ জন উপদেষ্টা।
গত ৮ আগস্ট রাতে নতুন সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠানের পর জাতির উদ্দেশে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “বিভিন্ন চেষ্টায় ব্যবহৃত হয়ে যারা অপরাধ সংঘটিত করেছে তাদের আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে শিগগিরই উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। একই কথা সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। সর্বত্র অপরাধীদের বিচার হবে।” এদিকে শপথ গ্রহণের আগেই বিমানবন্দরে নেমে তিনি বলেছেন, “আমার ওপর ভরসা রাখুন, দেশের কোথাও কারও ওপর হামলা হবে না।”
সরকার পতন ও গঠনে কার্যত তিন দিন বন্ধ হয়ে যায় দেশের সকল থানার কার্যক্রম। আতঙ্কে গা-ঢাকা দেন পুলিশ সদস্যরা। প্রায় চারদিন থানা পুলিশ কার্যক্রম নেই। একটা সূত্রের দাবি, ভীতি কাজ করছে কর্মস্থলে যোগদান করা পুলিশ সদস্যদের মাঝে।
আজ শুক্রবার (৯ আগস্ট) বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদ মসজিদে জুম্মা নামাজে আগত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে সরকার পতনের দিনে ঘটে-যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইউএনও কাজী শামীম বলেন, উপজেলা কমপ্লেক্সের সকল দপ্তরসমুহ নাশকতার শিকার। কর্মকর্তা কর্মচারীরা আতংকিত। উপজেলা নিবাহী অফিসারের কক্ষসহ সব দপ্তরের ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক ট্রুলস, এসি, ফ্যান, আসবাবপত্র ভাংচুর ও লুটপাট হয়ে যায়। বিশেষ করে সমাজসেবা অফিসের ল্যাপটপগুলো হাতছাড়া হওয়ায় সরকারি বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতাসহ নানা সহায়তা কার্যক্রম হুমকির মুখে। এতে এ উপজেলার সুবাধাভোগি লোকজনই বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। আবেগের বশবর্তী হয়ে যদি কেউ এগুলো নিয়ে থাকেন, তাহলে নিজে কিংবা যেকোন মাধ্যমে ফেরত দিলে ফেরতকারীর নাম গোপন রাখা হবে। ইউএনও শামীম আরও জানান, নাশকতা সমাজ ও দেশের শত্রু। বিয়ানীবাজার উপজেলা কমপ্লেক্সে একাধিক সিসি ক্যামেরা ভাংচুর হলেও কয়েকটি ক্যামেরায় লুটপাটের ফুটেজ রেকর্ড রয়েছে। পুলিশ বাহিনী যোগদান পরবর্তী তদন্তের মাধ্যমে এসব মালামাল উদ্ধারের কাজ শুরু হবে। এই মালামাল উদ্ধার কাজে তিনি সকল মুসল্লী ও বিয়ানীবাজার উপজেলার সকল শ্রেণি পেশার লোকের সহযোগিতা প্রার্থনা করেছেন।
প্রাপ্ত সূত্রমতে, সরকার পতন দিনে (৫ আগস্ট)
জনতার খন্ড খন্ড মিছিলের উল্লাসে বিয়ানীবাজার শহরে নামে ছাত্র-জনতার ঢল। এ সময় আওয়ামী ঘরানার লোকজন আড়ালে চলে যায়। ঘড়ির বেলা বাড়ার সাথে সাথে পৌরশহর হয়ে উঠে মিছিলের নগরী। বিয়ানীবাজারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়লেও কর্মরত কোন পুলিশ সদস্য এখানে হতাহত হয়নি।
বিকেলের দিকে পৌর শহরে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পৌরশহরের দক্ষিন বাজারে উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জামাল হোসেনের অফিস, কলেজ রোডস্থ উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতির কার্যালয়, উত্তর বাজারে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, সাবেক মেয়র আব্দুস শুকুর’র ব্যাক্তিগত কার্যালয়সহ আরও বিভিন্ন কার্যালয়ে ভাংচুর ও নাশকতার কবলে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শেষ বিকালে একদল বিক্ষুদ্ধ জনতা বিয়ানীবাজার উপজেলা কমপ্লেক্সের কয়েকটি সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে ভাংচুর চালায়। পরে বিয়ানীবাজার থানা ভবন এলাকায় প্রবেশ করে কয়েকটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ কোয়ার্টারে আগুন দেয়। এসময় থানার মুল ভবনে হামলার চেষ্টাকালে পুলিশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্নরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়ে। এ সময় পুলিশের ছুঁড়া গুলিতে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার অধিবাসী মোহাম্মদ রায়হান গাজী (নয়াগ্রামে একটি ভাড়া বাসায় বাস থাকতো), বিয়ানীবাজার পৌরশহরের ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী সুনামগঞ্জের ময়নুল ইসলাম, মোল্লাপুর ইউনিয়নের কটুখালিপার গ্রামের রফিক উদ্দিনের পুত্র মোঃ তারেক আহমদ নিহত এবং ছোটদেশ গ্রামের জনৈক সিদ্দিক চোখে গুলিবিদ্ধ ও দুবাগের তাজিমসহ আরোও অন্তত: ১৭ জন আহত হন। নিহতদের মরদেহ ময়না তদন্ত ছাড়াই পারিবারিকভাবে দাফন করা হয়েছে।
সরকার পতনের আতঙ্কে পুলিশ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় কার্যত ৪ দিন ধরে বিয়ানীবাজার উপজেলা পুলিশশূন্য। নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় দিন কাটাচ্ছে আমজনতা।
পুলিশবিহীন বিয়ানীবাজারের মানুষ গ্রাম্য সামাজিক বন্ধন শক্তির উপর ভিত্তি করে নিজ উদ্যোগে শান্তি রক্ষা করে চলছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য কোন অঘটনের সংবাদ শোনা যায়নি। রাস্তায় যানচলাচলের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেছে। সনাতন ধর্মালম্বীরাও নিরাপদে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী শামীম জানান, বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে জমিজমা দখল, বেদখল ও ব্যক্তিগত বিরোধ মাথাচাঁড়া দিয়ে ওঠেছে। এসব নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অনেকে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের এমন মুহুর্তে সবাইকে সতর্ক-সচেতন হওয়ার আহবান জানান।
গেল বৃহস্পতিবার বার (৮ আগস্ট) পুলিশ সদস্যদের থানায় ফেরার নির্দেশনা দিয়েছিলেন নতুন আইজিপি। তার এ নির্দেশনার পর আজ (৯ আগস্ট) রাত ৮ ঘটিকা পর্যন্ত বিয়ানীবাজার থানায় কোন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে যোগদান করেনি।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দেবদুলাল ধর এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, আমরা আগেই অস্ত্র জমা দিয়ে দিয়েছি। বর্তমানে সিলেটে আছি। তবে দ্রুতই কর্মস্থলে ফেরার আলোচনা আমাদের মাঝে চলছে। তবে সেনাবাহিনীর টিম উপজেলা চত্ত্বরে অবস্থান করছে।
এ উপজেলা তথা দেশের মানুষ জানমালের নিরাপত্তা চায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে জনমনে সাহস ফিরে আসুক, অরাজকতা দূর হোক। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় শান্তি ফিরে আসুক।