পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক: অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আজ (০৬ জুন) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট সংসদে উত্থাপন করবেন। এই বাজেট মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট। আর বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে এটি ৫৪তম বাজেট।
এক নজরে দেখা যাক, বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে বর্তমান সরকারের সর্বশেষ বাজেট :-
Πবঙ্গবন্ধুর আমল:
১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের জন্য ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। এই সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরেও তাজউদ্দীন আহমদ অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এই সময় বাজেট ছিল ৯৯৫ কোটি টাকার।
১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, বাজেট ছিল ১০৮৪.৩৭ কোটি টাকা।
Πখন্দকার মোশতাকের আমল:
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ড. আজিজুর রহমান ১৫৪৯.১৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Π জিয়াউর রহমানের আমল:
১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৮৯.৮৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরেলেফট্যানেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকার বাজেট, ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরেও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে ড. এম এন হুদা ৩ হাজার ৩১৭ কোটি ও ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন এম সাইফুর রহমান। ১৯৮১-৮২ অর্থবছরেও এম সাইফুর রহমান ৪ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πএইচএম এরশাদের আমল:
১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ঘোষণায় বাজেট ছিল ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরেও আবুল মাল আবদুল মুহিত ৫ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে এম সায়েদুজ্জামান ৬ হাজার ৬৯৯ কোটি এবং ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে এম সায়েদুজ্জামান ৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে এম সায়েদুজ্জামান ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা, ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে এম সায়েদুজ্জামান ৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে মেজর জেনারেল (অব.) মুনিম ১০ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ড. ওয়াহিদুল হক ১২ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে মেজর জেনারেল (অব.) মুনিম ১২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πখালেদা জিয়ার আমল:
১৯৯১-৯২ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ১৫ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ২০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা এবং ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πশেখ হাসিনার আমল:
১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ২ লাখ ৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ২৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ২৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ২৯ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ৩ লাখ ৪ হাজার ২৫২ কোটি টাকা, ২০০০-০১ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ৩৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা এবং ২০০১-০২ অর্থবছরে এসএএমএস কিবরিয়া ৪ লাখ ২ হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πখালেদা জিয়ার আমল:
২০০২-০৩ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৪ লাখ ৪ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
২০০৩-০৪ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৫১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৫৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৬ লাখ ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৬ লাখ ৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πফখরুদ্দিন আহমেদের আমল:
২০০৭-০৮ অর্থবছরে মির্জা আজিজুল ইসলাম ৮৭ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মির্জা আজিজুল ইসলাম ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
Πশেখ হাসিনার আমল:
২০০৯-১০ অর্থবছরে আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
২০১০-১১ অর্থবছরে আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩ লাখ ১০০ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্ভাব্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
২০১৯-২০ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
২০২৪-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেট ঘোষণা করলেন আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি তাঁর প্রথম বাজেট।
অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, ‘এবারের বাজেট সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রাকে সহজ করবে। বাজেটে অকারণে অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে লাভ নেই।’ বৃহস্পতিবার (০৬ জুন) নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট অনেক চ্যালেঞ্জ। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরে আনাই হবে অর্থমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে সরকার। আগামী বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী থাকছে, তার জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অপেক্ষায় আছেন। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ঋণ পরিশোধে ব্যয় উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ানো, সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতি গতিশীল রাখতে শিল্প খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে খরচ কমানোরও পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত কয়েক মেয়াদের মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ।
Πমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ:
সরকারি হিসাবেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি টানা ২২-২৩ মাস গড়ে ৯ শতাংশের ওপরে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুসারে গেল বছর যখন বাজেট পেশ হয়, তখনকার তুলনায় এবারে ১০টি জরুরি খাদ্যপণ্যের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য সাড়ে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারণকে বেশ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এবারের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে বাজেটে ‘সামাজিক সুরক্ষা খাতে’ বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ তাদের।
মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সাধারণ মানুষের মানুষের আয় বাড়েনি। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪-এর মে মূল্যস্ফীতির হার যখন ৯.৪১ থেকে শতাংশের ঘরে, তখন মজুরি বৃদ্ধির হার ৭.৩২ থেকে ৭.৮৫ শতাংশ। এমন প্রেক্ষিতে শুধু দিনমজুর নয়, দুর্দশায় আছে দেশের বেশির ভাগ মানুষ। টিসিবির তথ্য বলছে, দাম বেড়েছে চাল, সব ধরনের ডাল, রসুন, হলুদ, আলু, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ডিম, দুধসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের।
গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগামী অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো। অর্থনীতির বিদ্যমান অসুবিধা মোকাবিলায় আসন্ন বাজেটে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বাজেটে অনুৎপাদনশীল খাতের মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে বরং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা হলেও বাড়বে। করমুক্ত আয়সীমা যদি কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যারা নিচের দিকে আছেন, তাদের কিছুটা বাড়তি ব্যবহারযোগ্য আয় বাড়বে। যেটা হলে তাদের কেনার সামর্থ্য কিছুটা বাড়বে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক এম এম জুলফিকার আলী এ বিষয়ে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে চাইলেই হুট করে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাবে না। তবে বাজেট নীতি-সহায়তা দিয়ে ডলারের দাম এবং সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হলে পণ্যের দাম কিছুটা কমবে বা নতুন করে বাড়বে না। একই সঙ্গে বাজেটে বাজার নিয়ন্ত্রণেও কঠোরতা রাখতে হবে।
Πসুদ ব্যয় বাড়ছে:
প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়। বাজেটে অর্থায়নে দুটি উৎস থাকে। একটি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং অপরটি বিদেশি ঋণ ও অনুদান। তবে অনুদানের অংশ খুব কমই থাকে। ফলে বাজেট অর্থায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় সরকারকে।
বাজেটে বরাদ্দের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে। ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় এখন বাজেটের সর্বোচ্চ একক খাত। এটি এখন মোট বাজেটের সাড়ে ১৯ শতাংশ। প্রতিবছর বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়ছেই। এবার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সুদ পরিশোধে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ ব্যয় হবে অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে। বাকি ১০ শতাংশ বিদেশি ঋণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৮২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১২ হাজার ৩৭৬ টাকা বিদেশি ঋণ।
সূত্র জানায়, ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে সামগ্রিকভাবে ঘাটতি ধরা হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা হবে।
মেগা প্রকল্পসহ বড় অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশ যে ঋণ নিচ্ছে, তার পরিমাণ সাত বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন যে ঋণ করছে, তার একটি বড় অংশও যাচ্ছে সেই ঋণ পরিশোধের পেছনে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আয়ের একটা বড় অংশ যদি ঋণ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ কমে যাবে। এসব খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ঋণের বোঝা যেভাবে বাড়ছে তার বিপরীতে সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় একটি অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। এটি সরকারের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়- এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুদ পরিশোধের চাপ কমাতে হলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ তথা রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকার কঠিন চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘আমাদের দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। এর জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে যে পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়ার প্রয়োজন, তা জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। সে জন্যই ঋণ নিতে বাধ্য হয়।’
উন্নয়ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন: বাংলাদেশের বাজেটের বড় দুর্বলতা হচ্ছে বাস্তবায়নের সক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়া। যে কারণে বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না।
বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়ার কথা বলা হলেও সেটি কখনোই আমলে নিচ্ছে না সরকার। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির বাস্তবায়ন হার ৮০ শতাংশের ঘরে থাকলেও অনুন্নয়ন বা পরিচালন বাজেটের বাস্তবায়ন হার ৯০ শতাংশের বেশি হয়। উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়নও তাড়াহুড়ো করে হয় শেষ দিকে। যেমন গত পাঁচ অর্থবছর আগে থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি অর্থবছরেই প্রথম ৯ মাসে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হয়েছিল ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। পরের তিন মাসে হয় বাকিটা। শেষ সময়ে বাস্তবায়ন বেশি হওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, উন্নয়ন বাজেট তথা এডিপি বাস্তবায়নে নানা দুর্বলতা রয়েছে। এসব কারণের মধ্যে প্রকল্প পরিচালকদের কর্মস্থলে না থাকা অন্যতম। এ বিষয়টি কোনোভাবেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি বরাদ্দ করা অর্থ ছাড় নিয়েও সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র-প্রক্রিয়ায় জটিলতা, যন্ত্রপাতি, জনবলের ঘাটতিও এডিপি বাস্তবায়ন কম হওয়ার কারণ। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট ও সময়নিষ্ঠ পরিকল্পনার অভাবে বাজেট বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।
Πভর্তুকি কমানো:
আইএমএফ থেকে ভর্তুকি কমানোর চাপ দিলেও আগামী অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করতে হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি এবং প্রণোদনার জন্য ১ লাখ ১০ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ বরাদ্দ ১ লাখ ২০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা রাখা হতে পারে।
Πরাজস্ব আদায় বাড়ানো:
আন্তর্জাতিক বাজারের টানাপোড়নোর প্রভাব পড়েছে সমগ্র আর্থনীতিতে। ডলারের সংকট কাটেনি। অর্থসংকটে সরকার অনেক নিয়মিত ব্যয়ও বাধ্য হয়েই কাটছাঁট করেছে। আইএমএফের চাপে সরকারের আয় বাড়ানোর শর্ত থাকলেও ঘাটতি চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আইএমএফের চাপে আগামী অর্থবছরেও এনবিআরের ও এনবিআরবহির্ভূত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। আগামী বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর নন-এনবিআর মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৭ শতাংশ বেশি।
Πব্যবসায়ে খরচ কমানো:
আইএমএফকে খুশি করতে বাজেট ঘোষণার আগেই জ্বালানি খরচ বেড়েছে। আসন্ন বাজেটে ফার্নেস তেল, বেজ তেল ও লুব্রিকেন্ট তেলের ট্যারিফ মূল্য দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। ফলে জ্বালানির খরচ আরও বাড়বে। বাড়বে পণ্যমূল্য, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।
যোগাযোগ করা হলে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আগামী বাজেট বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুষম বিনিয়োগ সহায়ক মুদ্রা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, শিপিং খরচসহ সব ধরনের পরিবহন খরচ হ্রাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কমাতে হবে। না হলে ব্যবসায়ে খরচ কমবে না। এর ফলে কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।